Youngali Story, History, Solution, Picture, Song, Video, Scandels and Romance

Youngali Story, History, Solution, Picture, Song, Video, Romance......any thing for your one friend.

Tuesday, November 10, 2009

কোরআনের আলোকে নারী

ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী এমনভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে যেন সবগুলো ধর্মের মধ্যে ইসলামেই নারীকে সবচেয়ে বেশী অবমাননা করা হয়েছে এবং সবচেয়ে কম অধিকার দেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবতা কিন্তু ঠিক তার বিপরীত। প্রকৃতপক্ষে কোরআনে নারীদের নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করতে যাওয়া মানে তাদের বরং ছোট করা। কারণ কোরআনে নারী-পুরুষকে তো আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়নি। ছিটে-ফোটা যে দু-চারটি পার্থিব বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা হয় সেগুলো বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছুই না। সামান্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে সেগুলোকে খুব ভালভাবেই ডিফেন্ড করা সম্ভব। তাছাড়া কোরআনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন নারীকে বিশেষ সম্মান ও অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে তেমনি আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের উপরও অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব সবকিছু যোগ-বিয়োগ করে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে যে প্রকৃতিগতভাবে কিছু পার্থক্য আছে সেটা বিবেচনায় রেখে কোরআনে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য করা কিন্তু খুবই কঠিন।

কোরআনই সম্ভবত প্রথম গ্রন্থ যেটি কিনা নারী-পুরুষকে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা দিয়ে নারীদের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে। কোরআনের আগে কোন গ্রন্থ নারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে কি-না জানা নেই। পুরুষ মানেই পুরুষের পক্ষে এবং নারীদের বিপক্ষে – হাজার বছরের এই মানসিকতাকে কোরআনই প্রথম ভেঙ্গে দিয়েছে। নীচের আয়াতগুলো পড়ে ভেবে দেখুন, কোরআনে নারী-পুরুষের মধ্যে আদৌ কোন পার্থক্য করা হয়েছে কি-না।

“হে মানব-জাতি! তোমরা ভয় কর তোমাদের রবকে, যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের এক আত্মা থেকে এবং যিনি সৃষ্টি করেছেন তার থেকে তার জোড়া, আর ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের দু’জন থেকে অনেক নর ও নারী।” (সূরা নিসা ৪:১)

“যে ব্যক্তি ভালো কাজ করবে, হোক সে পুরুষ কিংবা নারী, এবং সে ঈমানদার হবে, এরূপ লোক জান্নাতে দাখিল হবে, আর তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না।” (সূরা নিসা ৪:১২৪)

“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্যে থেকে সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ কর এবং সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া।” (সূরা রূম ৩০:২১)

“আমি বিনষ্ট করি না তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর কর্ম, তা সে হোক পুরুষ কিংবা নারী। তোমরা একে অন্যের সমান।” (সূরা আল-ইমরান ৩:১৯৫)

“বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে, তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আনুগত্য করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। এদেরই উপর আল্লাহ রহমত বর্ষণ করবেন।” (সূরা তওবা ৯:৭১)

“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।” (সূরা বাকারা ২:১৮৭)

“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদেরকে পরিণত করেছি বিভিন্ন জাতিতে ও বিভিন্ন গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক মোত্তাকী।” (সূরা হুজুরাত ৪৯:১৩)

“যে ভালো কাজ করে এবং বিশ্বাসী, হোক সে পুরুষ কিংবা নারী, আমি তাকে অবশ্যই দান করব এক পবিত্র শান্তিময় জীবন এবং তারা যা করত তার জন্য তাদেরকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” (সূরা নাহল ১৬:৯৭)

“যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করে সে কেবল তদনুরূপ প্রতিফল পাবে। আর যে ব্যক্তি ভালো কাজ করে সে পুরুষই হোক কিংবা নারীই হোক, সে যদি বিশ্বাসী হয় তবে এরূপ লোকেরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, সেথায় তাদেরকে দেয়া হবে বেহিসাব রিযিক।” (সূরা মু’মিন ৪০:৪০)

“আমি মানুষকে তার মাতা-পিতা সম্বন্ধে নির্দেশ দিয়েছি তাদের সাথে সদাচরণ করতে। তার মাতা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দু’বছরে তার দুধ ছাড়ানো হয়। সুতরাং শোকরগুজারী কর আমার এবং তোমার মাতা-পিতার।” (সূরা লুকমান ৩১:১৪)

“নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, স্বীয় লজ্জাস্থান হেফাযতকারী পুরুষ ও স্বীয় লজ্জাস্থান হেফাযতকারী নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী – এদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান।” (সূরা আহযাব ৩৩:৩৫)

“সেদিন আপনি দেখতে পাবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে যে, তাদের নূর ছুটাছুটি করছে তাদের সামনে ও তাদের ডানে। তাদেরকে বলা হবে : আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ এমন জান্নাতের, যার নিম্নদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ, সেখানে তোমরা অনন্তকাল থাকবে। ইহাই মহা সাফল্য।” (৫৭:১২)

“পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার প্রাপ্য অংশ।” (সূরা নিসা ৪:৩২)

“পুরুষদের জন্য অংশ আছে সে সম্পত্তিতে যা পিতা-মাতা ও নিকট-আত্মীয়রা রেখে যায়; এবং নারীদের জন্যও অংশ আছে সে সম্পত্তিতে যা পিতা-মাতা ও নিকট-আত্মীয়রা রেখে যায়, হোক তা অল্প কিংবা বেশী। তা অকাট্য নির্ধারিত অংশ।” (সূরা নিসা ৪:৭)

“হে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের জন্য বৈধ নয় নারীদের জবরদস্তি উত্তরাধিকার গণ্য করা। আর তাদের আটকে রেখ না তাদের যা দিয়েছ তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করতে, কিন্তু যদি তারা কোন প্রকাশ্য ব্যভিচার করে তবে তা ব্যতিক্রম। তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করবে।” (সূরা নিসা ৪:১৯)

“যারা কোন ভালো নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই প্রকৃত দুষ্ট ও মিথ্যাবাদী।” (সূরা নূর ২৪:৪)

“এ কথা সত্য যে, নারীদের উপর পুরুষের যেমন কিছু অধিকার আছে তেমনি পুরুষের উপরও নারীদের কিছু অধিকার আছে।” (প্রফেট মুহাম্মদ)

"The Qur'an is like a Magna Carta for Women." -- Yvonne Ridley

বাস্তবতা দেখলেন তো! এ ছাড়াও আরো কিছু আয়াত আছে। এই পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মগ্রন্থে নারী-পুরুষকে এত বেশীবার পাশাপাশি সম্বোধন করা হয়নি এবং নারীদেরকে এভাবে সরাসরি মর্যাদা ও অধিকারও দেয়া হয়নি।

এবার আসা যাক কোরআনে নারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিয়ে। তার আগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যেটা অনেকেই এড়িয়ে যায়, সেটা হচ্ছে, যেভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সেভাবেই যদি কোরআনে নারীদেরকে দেখা হতো তাহলে তো আমেরিকা-ইউরোপের নারীরা ইসলামের দিকে ফিরেও তাকাত না! অথচ আমেরিকা-ইউরোপে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশী।

অভিযোগ: বোরখা-হিজাব হচ্ছে পশ্চাৎপদতা ও নির্যাতন-নিপীড়ন এর হাতিয়ার!

জবাব: আধুনিকতা বা সভ্যতার অর্থ যদি অর্ধ-উলঙ্গ বুঝায় তাহলে তো আদিম যুগের মানুষ পুরোপুরি আধুনিক ও সভ্য ছিল! কারণ তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াত! রাস্তা-ঘাটের উলঙ্গ পাগলা-পাগলিকেও তো তাহলে পুরোপুরি আধুনিক ও সভ্য বলতে হয়! পোশাক-পরিচ্ছদ হচ্ছে মানব সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি। মানুষ ও পশুর মধ্যে মৌলিক দুটি পার্থক্য হচ্ছে, সত্য-মিথ্যা বা ভাল-মন্দ বিচারের ক্ষমতা ও পোশাক-পরিচ্ছদ। এই দুটি মৌলিক পার্থক্য ছাড়া মানুষ ও পশুর মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। যাহোক, কোরআনে প্রচলিত বোরখার সরাসরি কোন ইঙ্গিত নেই। এমনকি হিজাবের কথাও সরাসরি বলা নেই (২৪:৩০-৩১, ৩৩:৫৯)। তবে হিজাবের ক্ষেত্রে মুসলিম স্কলারদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কোরআনে নারীদের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে স্বাধীনতা ও নমনীয়তা রাখা হয়েছে, যেটা দেশ-কাল-পাত্র ভেদে কিছুটা পরিবর্তনশীল হতে পারে। মজার বিষয় হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের পুরুষ সহ প্রায় সকল মৌলভি-মুন্সিরাও কিন্তু বোরখা-হিজাব পরিধান করে। অথচ কেউই কিন্তু তাদেরকে নির্যাতিত-নিপীড়িত বলে না! গোঁড়া সমালোচকদের দৃষ্টি শুধুই নারীদের দিকে। পোশাক-পরিচ্ছদ হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। সেই ব্যক্তিগত পছন্দ যে কীভাবে মানুষকে নির্যাতিত-নিপীড়িত করে সেটা কিন্তু কোনভাবেই মাথায় আসে না! মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা কুরুচির পরিচায়ক। যারা এমন উদ্ভট অপপ্রচার চালায় তাদের অসৎ কোন উদ্দেশ্য আছে। শারীরিক গঠনের ভিন্নতার কারণে কোরআনে নারীকে কিছুটা বেশী সতর্ক করা হয়েছে মাত্র। অন্যথায় নারী-পুরুষ উভয়কেই শালীন পোশাকের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়কেই সততা ও শালীনতা রক্ষার উপরই বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে (৭:২৬-২৮, ২:২৬৮, ১৭:৩২)। এ প্রসঙ্গে কোরআন আরো বলে: তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম (৭:২৬); তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন রকম সংকীর্ণতা আরোপ করেননি (২২:৭৮); দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই (২:২৫৬)।

অভিযোগ: কোরআনে যেহেতু একজন পুরুষের স্থলে দু’জন নারী সাক্ষীর কথা বলা আছে সেহেতু নারীর বুদ্ধিমত্তাকে পুরুষের চেয়ে কম মনে করা হয়েছে!

জবাব: প্রথমত, কোরআনের কোথাও বলা হয়নি যে পুরুষদের চেয়ে নারীদের বুদ্ধি কম। দ্বিতীয়ত, বিষয়টিকে যেভাবে ঢালাওভাবে প্রচার করা হয় সেরকম কিছু নয়। যে আয়াত থেকে এই অভিযোগ উত্থাপন করা হয় সেটি সম্ভবত কোরআনের মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়াত (২:২৮২)। অথচ পুরো আয়াত পড়ে বা না পড়ে সামান্য একটি অংশ বার বার উদ্ধৃত করে সমালোচনা করা হয়। আয়াতটি পুরোটা পড়লে কারো মনেই এই ধরণের অস্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনার উদয় হওয়ার কথা নয়। কোরআনে শুধু একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে একজন পুরুষের স্থলে দু’জন নারী সাক্ষীর কথা বলা আছে, আর সেটি হচ্ছে ঋণ লেন-দেন। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, একজন পুরুষ = দু’জন নারী! সাক্ষী সব সময় একজন নারীই দেবে। তবে অতিরিক্ত একজন নারীকে পাশে থাকতে বলা হয়েছে এ কারণে যে, আসল সাক্ষী কোন কারণে ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেবেন। এর পেছনে যুক্তি হচ্ছে, কোরআনে যেহেতু পুরুষকে অর্থনৈতিক বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেহেতু ধরে নেয়া হয়েছে যে তারা এ বিষয়ে পারদর্শী হবে। একমাত্র ঋণ লেন-দেন ছাড়া অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সাক্ষী সমান। যে সকল নারীরা ঋণ লেন-দেন নিয়ে কাজ করে তাদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য নাও হতে পারে – অর্থাৎ তাদের ক্ষেত্রে একজন সাক্ষীই যথেষ্ট। তাছাড়াও নারীদের কিছু সমস্যা যেমন গর্ভাবস্থা, রজঃস্রাব, শিশু বাচা লালন-পালন, ইত্যাদিও তো মাথায় রাখতে হবে। গর্ভাবস্থায় ও রজঃস্রাব কালে নারীদের যে কিছু কিছু সমস্যা হয় সেটা তো প্রমাণিত সত্য, যে সমস্যাগুলো পুরুষদের নেই।

অভিযোগ: কোরআনে স্ত্রীকে বেধরক প্রহারের অধিকার স্বামীকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু একই অধিকার স্ত্রীকে না দেয়াতে নারী-পুরুষকে সমান মনে করা হয়নি!

জবাব: প্রথমত, এই ধরাধামে কোরআন আসার আগে থেকেই আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে পুরুষরা নারীদেরকে প্রহার করে আসছে। তা-ই যদি হয় তাহলে এটি একটি বিশ্বজনীন ফিনমিন্যান এবং কোরআনের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি মোটেও সেরকম কিছু নয় যেভাবে অপপ্রচার চালানো হয়। কোরআনের ৪:৩৪ নাম্বার আয়াতের সামান্য একটি অংশ উদ্ধৃত করে স্ত্রীকে বেধরক প্রহার করার কথা লিখা আছে বলে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু তারা যেমন পুরো আয়াতটা পড়ে না তেমনি আবার কোরআনে এরকম একটি কথা কেন লিখা আছে সে বিষয়ে প্রশ্নও করে না। কোন কারণ ছাড়াই কি কাউকে প্রহার করার কথা লিখা থাকতে পারে! যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে নিশ্চয়। ধর্ম-বর্ণ-আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সকল সমাজেই নারীদেরকে কম-বেশী প্রহার করা হয়। এই কমন একটি ফিনমিন্যানকে কোরআনে পজেটিভ থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করে পরিবারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সম্ভাব্য একটি সমাধান দেয়া হয়েছে। তবে প্রহারকে শেষ থেরাপি হিসেবে রাখা হয়েছে। তার আগে দুই ধাপ থেরাপির কথা বলা হয়েছে। তার মানে প্রহারকে উৎসাহিত করা হয়নি নিশ্চয়। এই তিন ধাপ থেরাপি ফেইল করলে পরের আয়াতে চতুর্থ একটি সমাধান দেয়া হয়েছে (৪:৩৫)। এই আয়াত পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে, তার আগের আয়াতে আসলে গুরুতর সমস্যার কথাই বুঝানো হয়েছে। কোরআনের এই ধাপগুলো এতটাই স্বাভাবিক যে, ধর্ম-বর্ণ-আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে অনেকেই কিন্তু প্রয়োজনে ঠিকই প্রয়োগ করেন। অথচ একই কথা কোরআনে লিখা থাকাতে তথাকথিত নারীবাদীদের চোখ নাকি লজ্জায় অন্ধ হয়ে যায়, যেন মায়ের চেয়ে মাসির দরদই বেশী! তৃতীয়ত, নারীদেরকেও এই অধিকার দেয়া হলে তারা সেটা পুরুষের উপর প্রয়োগ করতে পারতেন কি-না। কোন নারী এই অধিকার চাইবেন বলেও মনে হয় না! নারীদেরকে আসলে এই অধিকার দেয়া বা না দেয়া একই কথা। কোরআন একটি বাস্তবিক ও প্রায়োগিক ধর্মগ্রন্থ, যেখানে আবেগের কোন স্থান নেই। চতুর্থত, কোরআনের এই আয়াতে যে আরাবিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সে অনুযায়ী প্রহার ছাড়াও নাকি আরো কিছু অর্থ আছে। অনুবাদকরা যদি আগে থেকেই জানতেন যে, কিছু মাসি এই তুচ্ছ একটি বিষয় নিয়ে মশা মারতে কামান দাগাবে তাহলে তারা হয়তো দেখে-শুনে সেরকম একটি শব্দই বসিয়ে দিতেন। সেক্ষেত্রে কিন্তু কারো মুখ খোলারই সুযোগ থাকতো না। অনুবাদকদের দূর্ভাগ্যই বলতে হবে! একই আরাবিক শব্দের একাধিক অর্থ থেকে থাকলে কোরআনকে কিন্তু দোষ দেয়া যাবে না। পঞ্চমত, কোরআন যদি প্রফেট মুহাম্মদের নিজস্ব বাণী হতো এবং তাঁর যদি পুরুষের হাতে অসৎ স্ত্রীকে অচ্ছামতো পিটিয়ে নেয়ার সত্যি সত্যি ইচ্ছা থাকতো, যেভাবে বলা হয়, তাহলে ধাপে-ধাপে এত কিছু না বলে সরাসরি গরম লোহার রড দিয়ে বেধরক প্রহার করার কথাই লিখা থাকতো। অতএব কোরআন যে প্রফেট মুহাম্মদের নিজস্ব বাণী হতে পারে না, তার স্বপক্ষে অনেক যুক্তি-প্রমাণের মধ্যে এটিও একটি। কোরআন এমন একটি গ্রন্থ, যার বিরুদ্ধে যে কোন সমালোচনা বুমেরাং হতে বাধ্য!

অভিযোগ: কোরআনে নারীদের মাসিক রজঃস্রাবকে রোগ বলা হয়েছে – অতএব অবৈজ্ঞানিক!

জবাব: কিছু অন্ধ ও গোঁড়া সমালোচক কোরআনের ২:২২২ নাম্বার আয়াতের পিকথালের অনুবাদ থেকে ‘Illness’ শব্দের অর্থ ‘রোগ’ বানিয়ে দিয়ে কোরআনকে শুধু অবৈজ্ঞানিক বলেই ক্ষান্ত হয়নি, সেই সাথে আবোল-তাবোল অনেক কিছুই বলেছে। অথচ ‘Illness’ শব্দের অর্থ হচ্ছে অসুস্থতা, রোগ নয়। রোগ আর অসুস্থতা তো এক জিনিস নয়। আয়াতটাতে আসলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথাই বলা হয়েছে, অন্য কিছু নয়। পিকথালের অনুবাদে ‘Illness’ শব্দটা দেখেই রোগ বানিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ তার পরে যে ‘পবিত্র বা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকট যাবে না’ লিখা আছে সেটা দেখার আর প্রয়োজন বোধ করেনি। রোগ আবার পরিষ্কার করা যায় নাকি! পাগোল কি আর গাছে ধরে!

অভিযোগ: কোরআনে স্ত্রীকে শষ্যক্ষেত্রের সাথে তুলনা করে হেয় করা হয়েছে!

জবাব: এক্ষেত্রেও কোন কোন অনুবাদক ‘শষ্যক্ষেত্র’ শব্দটা ব্যবহারই করেননি (২:২২৩)। আবারো অনুবাদকদের দূর্ভাগ্য! যাহোক, আয়াতটাতে প্রকৃতপক্ষে কী বুঝাতে চাওয়া হয়েছে সেটা যে কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই বোঝার কথা। স্বামী-স্ত্রীকে একটি ন্যাচারাল সিস্টেমের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এরকম একটি ন্যাচারাল উদাহরণকে যারা নোংরা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে তাদের মন-মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। নাকি উদাহরণটা কোরআনে আছে বলে নোংরা হয়ে গেছে কিন্তু কোন সাহিত্যের গ্রন্থে থাকলে সেটা হতো আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতা! আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সবায় কিন্তু স্ত্রীকে ‘শষ্যক্ষেত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে ঠিকই ফসল ফলাচ্ছেন। অথচ কোরআনের ক্ষেত্রে কারো কারো যেন লজ্জার সীমা নেই! এই ন্যাচারাল সিস্টেমকে এড়াতে হলে অবাস্তবধর্মী তথা সাধু-সন্ন্যাসী জীবন যাপন ছাড়া অন্য কোন পথ কিন্তু খোলা নেই!

মজার বিষয় হচ্ছে কোরআনের ২:২২২ নাম্বার আয়াতে নারীদের মাসিক রজঃস্রাবকে ‘অসুস্থতা’ বা ‘অশুচি’ বলাতে এবং ২:২২৩ নাম্বার আয়াতে স্ত্রীকে ন্যাচারাল শষ্যক্ষেত্রের সাথে তুলনা করাতে কিছু অন্ধ ও গোঁড়া সমালোচক যেখানে কোরআনকে নারী বিদ্বেষী ও অবৈজ্ঞানিক বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে সেখানে প্রফেসর টিভিএন পারসাউড ও প্রফেসর কেইথ মূর এর মতো বিশেষজ্ঞ তারই মধ্যে আবার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পান! কারো বিশ্বাস না হলে এই লিঙ্ক থেকে ভিডিওটা দেখা যেতে পারে।

অভিযোগ: কোরআনে যেহেতু নারীকে পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি দেয়া হয়েছে সেহেতু নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দেয়া হয়নি!

জবাব: কোরআনের আগে-পরে কোন ধর্মগ্রন্থে নারী-পুরুষকে সমান-সমান সম্পত্তি তো দূরে থাক নারীকে আদৌ কোন সম্পত্তি দিয়েছে কি-না সন্দেহ। এমনকি মুসলিমদের মধ্যে অনেকেই তাদের নারীদেরকে পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তিই দেয় না। এই যখন বাস্তবতা তখন ‘অর্ধাংশ’ ও ‘এক-তৃতীয়াংশ’ নিয়ে উলুজাগর দেয়ার তো কোন অর্থ হয় না। সার্বিকভাবে সবকিছু বিচার-বিবেচনা করে কোরআনে নারীকে কিছুটা কম সম্পত্তি দেয়ার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে (৪:৭, ৪:১১-১২, ৪:৭৬)। যেমন: (১) কোরআনে নারী-পুরুষ উভয়কেই রোজগারের অনুমতি দেয়া হয়েছে (৪:৩২) অথচ পরিবারের সকল প্রকার ভরণপোষণের দায়-দায়িত্ব শুধু পুরুষের ঘাড়েই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে (৪:৩৪)। অর্থাৎ একজন নারী যা রোজগার করবে সেটা তার নিজস্ব কিন্তু পুরুষের রোজগার থেকে সংসারের সকল প্রকার খরচ বহন করতে হবে। নারীকে কি তাহলে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলো না? পরিবারের সকল প্রকার ভরণপোষণের দায়-দায়িত্ব নারীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হলে গোঁড়া সমালোচকদের সারা জীবনের ঘুমই হয়তো হারাম হয়ে যেত! (২) বিবাহ বিচ্ছেদের পরও নারীর ভরণপোষণের ভার পুরুষের উপর ন্যাস্ত করা হয়েছে (২:২৪১)। এমনকি বিধবাদের ভরণপোষণের কথাও বলা হয়েছে (২:২৪১)। (৩) কোরআন অনুযায়ী একজন নারী তার স্বামীর সম্পত্তিরও অংশ পাবে। (৪) নারী-পুরুষকে সমান-সমান সম্পত্তি দেয়া হলে পুরুষদের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হতো। কারণ নারীরা বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি যেয়ে স্বামী-সন্তান সহ সেখানেই সেটল হয়ে যায়। ফলে ভাইয়ের পরিবারের এতগুলো সম্পত্তি কীভাবে স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাবে, এ নিয়ে সমস্যা হতো। প্রকৃতপক্ষে স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ না হলে অনেক নারীই তাদের পিতার পরিবার থেকে কোন সম্পত্তি নেয় না। এবার দিন শেষে সুবিধা-অসুবিধার কথা মাথায় রেখে সবকিছু যোগ-বিয়োগ করার পর নারীদের ‘এক-তৃতীয়াংশ’ কি প্রকৃতপক্ষে ‘এক-তৃতীয়াংশ’-ই থাকবে নাকি বেশী হওয়ার কথা? বিষয়টাকে ইসলামের দর্শনের আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ না করে কোরআনকে হেয় করার জন্য লোক দেখানো নারীবাদী সেজে অযথায় মায়াকান্না করলেই তো আর হবে না!

অভিযোগ: কোরআনে যেহেতু শুধু পুরুষকে একই সাথে একাধিক স্ত্রী রাখার অধিকার দেয়া হয়েছে সেহেতু কোরআনে নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দেয়া হয়নি! এমনকি কোরআনে পুরুষের বহুবিবাহ একটি অমানবিক প্রথাও বটে!

জবাব: প্রথমত, পুরুষকে কোন অধিকার দেয়া হলে সেই একই অধিকার নারীকেও দিতে হবে, তাহলেই কেবল নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দেয়া হবে, মুসলিমরা এই ধরণের অবাস্তব যুক্তিতে বিশ্বাস করে না। কারণ নারী-পুরুষের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্যের কারণে বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরকে সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার দেয়া আদৌ সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, মুসলিম নারীরা একই সাথে একাধিক স্বামী রাখার জন্য কান্নাকাটি করে না। কারণ তারা খুব ভালভাবেই অবগত যে, একই সাথে একাধিক স্বামী রাখাটা যৌক্তিক বা সুখের কিছু নয়। তৃতীয়ত, কোরআনের কোথাও সরাসরি বলা হয়নি যে নারীরা একই সাথে একাধিক স্বামী রাখতে পারবে না। কিছু নৈতিক ও যৌক্তিক কারণের উপর ভিত্তি করে এটি মুসলিমদের একটি স্ট্যান্ড। ফলে অমুসলিমরা কখনো এই প্রথাকে সমাজে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে এলে মুসলিমরা তখন ভেবে দেখতে পারে।

চতুর্থত, পুরুষের বহুবিবাহ প্রথা যদি এতটাই অমানবিক কিছু হতো তাহলে আব্রাহামের একাধিক ওয়াইফ থাকে কীভাবে! সলোমনের এক হাজার ওয়াইফ ও কনকিউবাইন থাকে কীভাবে! ডেভিডের একাধিক ওয়াইফ ও কনকিউবাইন থাকে কীভাবে! শ্রীকৃষ্ণের ষোল হাজারেরও বেশী ওয়াইফ ও গোপি থাকে কীভাবে! অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা এতদিন ধরে বহুবিবাহ প্রথা চালু রেখেছিল কীভাবে! এই তো মাত্র কিছুদিন আগে পশ্চিমা বিশ্বে পুরুষের বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে আইন করা হলো। তার মানে এই আইন পাশ করার আগ পর্যন্ত পুরুষের বহুবিবাহ প্রথা কি মানবিক ছিল? অথচ ইসলামে পুরুষের বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে এমনভাবে অপপ্রচার চালানো হয় যেন তারা জীবনে কখনো এই প্রথার নামই শোনেনি!

পঞ্চমত, ইসলামে পুরুষের বহুবিবাহ অবশ্য করণীয় কোন কর্তব্য নয়। বহুবিবাহের জন্য কেউ ভাল মুসলিমও হবে না। প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের মধ্যে খুব কম পুরুষেরই একই সাথে একাধিক স্ত্রী আছে। তার মানে এটি জনপ্রিয় কোন প্রথা নয়। তাছাড়া কাউকে জোর করে হয়তো ধর্ষণ করা যায় কিন্তু জোর করে বিয়ে করে স্ত্রী হিসেবে তো আর রাখা যায় না। এক্ষেত্রে জোর-জবরদস্তির কিছু নেই (৪:১৯, ২:২৫৬)। তবে কোন নারী যদি স্ব-ইচ্ছায় অন্য কারো স্ত্রীর সাথে যৌথভাবে থাকতে চায় এবং সেই পুরুষের পক্ষে যদি একাধিক স্ত্রীর দায়িত্ব নেয়া সম্ভব হয় সেক্ষেত্রে তো কারো গাত্রদাহ হওয়ার কথা নয়! একই সাথে একাধিক অবৈধ মিসট্রেস রাখা গেলে একাধিক বৈধ স্ত্রী রাখা যাবে না কেন? বরঞ্চ অবৈধ মিসট্রেস এর ক্ষেত্রে কোন দায়িত্ব যেমন নিতে হয় না তেমনি আবার বিভিন্ন সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে।

ষষ্ঠত, ইসলামে পুরুষের বহুবিবাহকে সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। কারণ কোরআনে মূলতঃ বিধবা নারীদেরকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে বলা হয়েছে (৪:২-৩)। পাশাপাশি তাদের প্রতি ন্যায়বিচারও করতে বলা হয়েছে। তবে স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে না পারলে একজনই যথেষ্ট। অতএব ইসলামে পুরুষের বহুবিবাহ কোন সামাজিক সমস্যা তো নয়-ই, বরঞ্চ প্রয়োজনে সামাজিক সমস্যার যৌক্তিক ও মানবিক একটি সমাধান হতে পারে।

সপ্তমত, যে পশ্চিমা বিশ্বের নিয়ম-নীতিকে ‘আদর্শ’ বা ‘গডের অভ্রান্ত বাণী’ ধরে নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সেই পশ্চিমা বিশ্বেরই হাজার হাজার নারী-পুরুষ প্রতি বছর ইসলাম গ্রহণ করে ইসলাম সম্পর্কে কী বলেন সেটা জানাটা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে একটি নমুনা দেখা যেতে পারে:



অভিযোগ: কোরআনে অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের বিয়ে করার কথা লিখা আছে!

জবাব: কোরআনের ৬৫:৪ নাম্বার আয়াতের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে অভিযোগ করা হয় এই বলে যে, কোরআনে অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের বিয়ে করার কথা লিখা আছে! অথচ সেই অংশবিশেষ ‘Those who have no courses’ বলতে বুঝানো হয়েছে যে, শারীরবৃত্তীয় বা অজানা কোন কারণে নারীদের রজঃস্রাব সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ থাকতে পারে। এখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের বুঝানো হয়নি। তাছাড়া এই আয়াতের কোথাও অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের বিয়ে করার কথা বলা হয়নি। কোরআনে বরঞ্চ প্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের বিয়ে করার ইঙ্গিতই দেয়া আছে (৪:১৯-২১)। এমনকি কোরআনে বিয়েকে ‘পবিত্র চুক্তি’ বলা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের সাথে কি ‘পবিত্র চুক্তি’ করা সম্ভব?

অভিযোগ: কোরআনে অমানবিক হিলা বিয়ের কথা লিখা আছে!

জবাব: প্রথমত, কোরআনে ‘হিলা বিয়ে’ নামে কোন বিয়ের কথা লিখা নেই। দ্বিতীয়ত, ইসলামের আগে কোন ধর্মেই তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়নি। অথচ ইসলামে তালাকপ্রাপ্তা নারী ইচ্ছে করলে তার পছন্দ অনুযায়ী অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেন (২:২২৯-২৩২)। তৃতীয়ত, ইসলাম নিয়ে যারা স্টাডি করেছেন তারা খুব ভাল করেই জানেন যে, স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয় (২:২২৬-২৩০)। অন্ধ ও গোঁড়া সমালোচকদের মনগড়া অপপ্রচারকে ইসলাম সমর্থন করে না। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে তালাককে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন সমস্যা হলে পুনর্মিলনের জন্যও কিছু দিক-নির্দেশনা ও বিভিন্নভাবে তাগাদা দেয়া হয়েছে (৪:৩৪-৩৫, সূরা তালাক)। এ বিষয়ে পুরুষের উপর কিছুটা বেশী দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই ধাপগুলো অনুসরণ করার পরও তিন তালাক হয়ে গেলে সেই নারী-পুরুষ একে অপরের জন্য অবৈধ হয়ে যায় (২:২৩০)। পাশাপাশি সেই পুরুষকে লম্পট বা সেরকম কিছু একটা ধরে নেয়া হয়। অথবা ধরে নেয়া হয় যে, তাদের দু’জনার মধ্যেই অথবা কোন একজনের মধ্যে এমন কোন সমস্যা আছে যার জন্য তাদের মধ্যে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন না করাটাই উত্তম। এর পরও তিন তালাকপ্রাপ্তা কোন নারী যদি অবৈধ সম্পর্ককে বৈধ করে সেই পুরুষের সাথেই আবার ঘর করতে চায় সেক্ষেত্রে সেই নারীকেই শাস্তি ভোগ করতে হবে। কারণ ইসলামে তাকে অন্য কাউকে বিয়ে করার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। বিয়ে কোন পুতুল খেলা নয় যে, ইচ্ছেমতো তালাক দেয়া যাবে আবার ইচ্ছেমতো গ্রহণ করা যাবে। দু’দিন পর হয়তো আবারো তালাক দেয়া হবে! চতুর্থত, কোরআনের কোথাও সেই সাময়িক বিয়ের পর স্বামীর সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপনের কথা লিখা নেই। এটি শাস্তি হিসেবে একটি প্রতীকি বিয়েও হতে পারে যাতে করে অন্য কেউ যেন এই ধরণের কাজ না করে। এখানে স্মরণ রাখতে হবে যে, কোন নারীকে কিন্তু জোর করে কারো সাথে বিয়ে করিয়ে দেয়া হচ্ছে না। ফলে বল কিন্তু তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীদের কোর্টেই থাকছে। তারা ইচ্ছে করলেই কোরআনের এই শাস্তি এড়াতে পারেন। তবে এখানে অমানবিকতার কোন প্রশ্নই ওঠে না। বিয়ে আবার অমানবিক হয় কীভাবে!

অভিযোগ: কোরআনে নারী-নারী ব্যভিচারের ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত ঘরে আবদ্ধ করে রাখার বিধান আছে অথচ পুরুষ-পুরুষ ব্যভিচারের ক্ষেত্রে কোন শাস্তির বিধান নেই! এমন বৈষম্যপূর্ণ বিধান থাকার পরেও নারী-পুরুষ সমান হয় কীভাবে!

জবাব: প্রথমত, অন্ধ ও গোঁড়া সমালোচকরা কখনোই কোরআনের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করে না। কারণ কোরআনে পুরুষ-পুরুষ ব্যভিচারের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান আছে। এই বিষয়টি কোরআনের ৪:১৫-১৭ নাম্বার আয়াতে পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, যে কোন সমাজের দৃষ্টিতে ব্যভিচারকে একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে কেউ নিজে অপরাধী না হলে শাস্তির জন্য তো ভয় পাওয়ার কথা না, তা যে ধরণের শাস্তিই হোক না কেন! তৃতীয়ত, নারী-নারী ব্যভিচারের ক্ষেত্রে সরাসরি শাস্তির কথা বলা হয়নি। তাদের ক্ষেত্রে শাস্তি তখনই হবে যখন নিদেনপক্ষে চারজন লোক ব্যভিচারের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। অর্থাৎ কোরআনে পরোক্ষভাবে যেটা বুঝাতে চাওয়া হয়েছে সেটা হচ্ছে, “তোমাদের ‘কার্যকলাপ’ ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখ। যেখানে সেখানে মানুষের সামনে অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পরিবেশ দূষিত কর না। তোমাদের আশেপাশে শিশু বাচ্চারাও থাকতে পারে।” ফলে শাস্তি এড়াতে চাইলে এসব ‘কার্যকলাপ’ ঘর অথবা নির্জন জায়গার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে! চতুর্থত, নারীদের ক্ষেত্রে কোনরকম শারীরিক শাস্তির বিধান নেই। তাদেরকে শুধু মৃত্যু পর্যন্ত ঘরে আবদ্ধ করে রাখতে বলা হয়েছে। এও বলা হয়েছে, “তাদেরকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখবে যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা করেন।” ফলে তাদেরকে হয়তো মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না! অন্যদিকে পুরুষ-পুরুষ ব্যভিচারের ক্ষেত্রে কোন সাক্ষী ছাড়াই সরাসরি শারীরিক শাস্তির বিধান আছে। সর্বোপরি, তার পরের আয়াতে খুব পরিষ্কার করেই বলা আছে, “অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন, যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে ফেলে, তারপর অবিলম্বে তওবা করে; এরূপ লোকের তওবাই আল্লাহ কবুল করেন।” (৪:১৭) অতএব আল্লাহর কাছে নারী-পুরুষ আসলেই সমান। তবে প্রকৃতিগতভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে কিছু পার্থক্যের কারণে পার্থিব দু-একটি ক্ষেত্রে উনিশ-বিশ হতে পারে যদিও সেরকম মনে হয় না।

অভিযোগ: কোরআনে ক্রীতদাসীদের সাথে সেক্স করার কথা লিখা আছে – অতএব অমানবিক!

জবাব: প্রথমত, কোরআনের কোথাও ক্রীতদাস প্রথার কথা লিখা নেই। ক্রীতদাস প্রথা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। কোরআনে যুদ্ধবন্দীদেরকে রক্ষণাবেক্ষণ বা আশ্রয় দানের জন্য নিজের অধীনে রাখার কথা লিখা আছে এবং কেউ চাইলে নারীদের সাথে সেক্স করতে পারে। তবে তাদের সাথে সেক্স করা কর্তব্য বা পবিত্র কিছু যেমন নয় তেমনি আবার তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও কিছু করা যাবে না (২৪:৩৩)। প্রকৃতপক্ষে তাদের সাথে কেউ সেক্স করতে চাইলে তাদেরকে বিয়ে করার জন্য তাগাদা দেয়া হয়েছে (৪:২৫)। দ্বিতীয়ত, কোরআনে সেক্স এর কথা শুনলে কারো কারো মুখমন্ডল লজ্জায় ফেকাসে হয়ে যায় কেন সেটাও কিন্তু বোঝা যায় না! সাধু-সন্ন্যাসী নাকি! নাকি তারা নতুন করে নৈতিকতার উপর রেভিলেশন পেয়েছে, যেখানে যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথে সেক্স হারাম ঘোষণা করা হয়েছে? সেক্স অমানবিক কিছু না হলে যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথে সেক্স করা অমানবিক হবে কেন! কোরআনে যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথে সেক্স নিয়ে কারো কারো যেন লজ্জার সীমা নেই। আহ! মায়ের চেয়ে সৎ-মায়ের দরদই বেশী! কোরআনে ক্রীতদাস-দাসী ও যুদ্ধবন্দীদের সাথে সদ্ব্যব্হার এবং তাদেরকে মুক্ত করে দেয়ার কথা বিভিন্নভাবে এবং বহুবার বলা হয়েছে। এও বলা হয়েছে যে, এটি একটি অত্যন্ত মহৎ কাজ (৯০:১২-১৩, ২:১৭৭, ৪৭:৪, ৯:৬০, ৫:৮৯, ৪:২৫, ৪:৯২, ২৪:৩৩, ৫৮:৩)।

এই একবিংশ শতাব্দীতেও যেখানে কোন কোন ধর্ম ও কালচারের প্রভাবে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ নারী শিশুর ভ্রুণ হত্যা করা হচ্ছে সেখানে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই কোরআনে এই চরম অমানবিক প্রথাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে (১৬:৫৮-৫৯, ৮১:৮-৯, ১৭:৩১)। এই অধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগেও যেখানে কোন কোন দেশে ধর্ম ও কালচারের প্রভাবে যৌতুকের জন্য অনেক নারীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত-নিপীড়িত থেকে শুরু করে হত্যার শিকার পর্যন্ত হতে হচ্ছে সেখানে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে কোরআনে উল্টোদিকে নারীকেই বিয়ের সময় উপহার দিতে বলা হয়েছে (৪:৪)।

কোরআনে নারীদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো তুলে ধরা হলো তার বেশী কিছু নেই, এবং এই অভিযোগগুলোর প্রায় সবই ধর্ম-বর্ণ-আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সকল সমাজেরই কম-বেশী ফিনমিন্যান। অথচ নারীদের বিষয়ে কোরআনের মূল শিক্ষাকে কৌশলে এড়িয়ে যেয়ে এখানে-সেখানে থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আয়াতের অংশবিশেষ বেছে নিয়ে সেগুলোর সাথে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যোগ করে মনের মাধুরি মিশিয়ে কোরআনকে নারী বিদ্বেষী বলে অপপ্রচার চালানো হয়!

পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলে রাখি, আমি ব্যক্তিগতভাবে নারী-পুরুষের সম-অধিকারে বিশ্বাসী। শারীরিক ও ন্যাচারাল কিছু পার্থক্য ছাড়া নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মানুষ। অতএব, শারীরিকভাবে দুর্বল বলে নারীদেরকে কোন অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রশ্নই ওঠে না। তবে এক্ষেত্রে মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হচ্ছে, নারী-পুরুষের ‘সম-অধিকার’ বলতে আসলে কী বুঝানো হয়? আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, এ বিষয়ে নানা মনির নানা মত থাকবে। এমনকি স্থান-কাল-পাত্র ভেদেও বিভিন্ন রকম মতামত থাকতে পারে। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে কোনভাবেই ঐক্যমতে পৌঁছানো সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে অনেক ভেবে-চিন্তে এই আর্টিকলটি লিখেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি কোরআনে নারী-পুরুষকে সার্বিকভাবে সমান মর্যাদা ও অধিকার দেয়া হয়েছে। আমার মনে কোন রকম দুর্বলতা থাকলে এরকম একটি আর্টিকল লিখতে যেতাম না নিশ্চয়। ফলে এর বিরুদ্ধে কেউ অপপ্রচার চালালে তাকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া হবে না।

0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home